নড়াইল প্রতিনিধি: ঈদকে সামনে রেখে নড়াইল ট্রাফিক পুলিশ ব্যাপক এবং নজিরবীহিন চাঁদাবাজিতে নেমেছে। ট্রাফিক পুলিশের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ দীর্ঘদিনের হলেও ঈদ আসন্ন হওয়ায় সম্প্রতি তারা চাঁদাবাজির নতুন মিশনে নেমেছে। বাস, ট্রাক, মাইক্রোবাস, কার, পিকআপ, মটরসাইকেল, ট্রাকটর, নসিমন, করিমন, ইজিবাইকসহ বিভিন্ন যানবাহন থেকে আগের তুলনায় অতিরিক্ত টাকা আদায় করছে। টাকা না দিলে এমনকি লাশবাহী গাড়িও ছাড়া পাচ্ছে না ট্রাফিক পুলিশের হাত থেকে! গ্রামগঞ্জ থেকে সংকটাপন্ন জরুরি রোগি নিয়ে সদর হাসপাতালের উদ্দেশে আসা নসিমন করিমনকেও থামিয়ে টাকা আদায় করেই পরে শহরে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে। এসব অভিযোগ ভূক্তভোগীসহ সংশ্লিষ্ট সব মহলের।
অভিযোগের প্রেক্ষিতে তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, নড়াইল শহর ও শহরতলীর যে সমস্ত পয়েন্টে ট্রাফিক পুলিশের ডিউটি রয়েছে তার সবক’টিতেই ব্যাপক চাঁদাবাজি চলছে। সাধারণত ডিউটিরত পুলিশ বাঁশি দিয়ে (বাজিয়ে) যানবাহন থামিয়ে দেয়, আর সঙ্গে সঙ্গে তাদের নিয়োজিত দালালরা চালকের কাছ থেকে নির্ধারিত হারের টাকা আদায় করছে। বৈধ কাগজপত্র থাকায় কেউ টাকা দিতে অস্বীকার করলে যানবাহন দাঁড় করিয়ে মোবাইল ফোনে খবর দেয়া হচ্ছে ট্রাফিক সার্জেন্টকে। তাৎক্ষণিকভাবে হাবিলদার হায়দার ও তথাকথিত ক্যাশিয়ার হেলালকে নিয়ে সার্জেন্ট তপন হাজির হচ্ছেন সেখানে। এরপর কাগজপত্র ঠিক নেই বলে মামলার ভয় দেখিয়ে আদায় করছেন মোটা অংকের টাকা। ট্রাফিক পুলিশের চাঁদা আদায়ের সবচেয়ে স্বস্তিদায়ক স্থান ট্রাফিক অফিস মোড় এলাকা। এখানে যানবাহন ঠেকিয়ে চালকদেরকে ট্রাফিক অফিসের মধ্যে ডেকে নিয়ে দর কষাকষির মাধ্যমে চলে টাকা আদায়ের কাজটি। টাকা না দেয়ায় হাবিলদার হায়দারের বিরুদ্ধে গায়ে হাত তোলারও অভিযোগ রয়েছে। মটরসাইকেল চালক যশোরের বেজপাড়া এলাকার ইমরানের (২৫) অভিযোগ ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকায় তার কাছে ২০০ টাকা চায় কনস্টেবল হেলাল। এ নিয়ে কথাকাটাকাটির এক পর্যায়ে হাবিলদার তাকে শারিরীকভাবে লাঞ্ছিত করে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি প্রতিষ্ঠিত কোম্পানীর বিক্রয় প্রতিনিধি অভিযোগ করেন, ডিপো থেকে পিকআপে করে নড়াইলে নিয়মিত মাল আনার জন্য ট্রাফিক পুলিশকে প্রতিমাসে ৫শ’ টাকা করে দিতে হয়। তবে ঈদ উপলক্ষে চলতি মাসে ৮০০ টাকা দিতে হয়েছে। নসিমন চালক সদর উপজেলার ফুলসর গ্রামের মোজাম (৩২) অভিযোগ করেন, ট্রাফিক অফিস মোড়ে পুলিশ তার নসিমন থামিয়ে ২শ’ টাকা দাবি করে। কিন্তু কাছে টাকা না থাকায় তার নসিমন আটক করে থানায় দেয়া হয়। কাশিয়ানির নজরুল ইসলাম অভিযোগ করেন, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে নিকটাত্মীয়ের লাশ বাড়ি নেয়ার পথে নড়াইল ট্রাফিক পুলিশকে ২শ’ টাকা দিতে হয়েছে। তবে নড়াইল ট্রাফিক পুলিশের সার্জেন্ট তপন মজুমদার সব অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, যাদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নেই তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ায় তারাই নানা অপপ্রচার চালাচ্ছে।
বেনাপোল প্রতিনিধি: ঈদকে সামনে রেখে যশোর শহরে যানজট সমস্যা তীব্র আকার ধারণ করেছে। হাজার হাজার ইজিবাইক, রিকশা, ভ্যান ও অন্যান্য যানবাহন চলাচলের কারণে শহরের মানুষ জিম্মি হয়ে পড়েছে। ট্রাফিক পুলিশের চাঁদাবাজির কারণে প্রতিনিয়ত শহরে এই যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে বলে বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, যশোর শহরের ১৯টি পয়েন্টে ট্রাফিক পুলিশ ইজিবাইক, আলম সাধু, নসিমন ও করিমনসহ অন্যান্য যানবাহন থেকে ১০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করছে। যারা চাঁদার টাকা দিচ্ছে শুধু তারাই যানবাহন নিয়ে শহরে ঢোকার অনুমতি পাচ্ছে। পাশাপাশি শহরের যেখানে সেখানে বেপরোয়া পার্কিং করার কারণে পথচারীরা জিম্মি হয়ে পড়েছে।
সূত্র জানায়, যশোর পৌর এলাকায় লাইসেন্সপ্রাপ্ত রিকশা-ভ্যানের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। কিন্তু ঈদকে সামনে রেখে অর্থ উপার্জনের আশায় শহরে আরও প্রায় ৮-১০ হাজার রিকশা-ভ্যান ঢুকে পড়েছে। এরপর যোগ হয়েছে অন্তত আট সহস্রাধিক ইজিবাইক। এর মধ্যে মাত্র ৮২৭টি ইজিবাইকের শহরে চলাচলের অনুমতি রয়েছে। এছাড়াও প্রতিদিন ২-৩ হাজার নসিমন, করিমন ও আলম সাধু শহর দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। শহরের কয়েকটি নির্দিষ্ট পয়েন্ট থেকে যাত্রী ওঠানামা করার জন্য পৌরসভা থেকে ইজিবাইক চালকদের শর্ত বেঁধে দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অনুমোদনবিহীন ইজিবাইকগুলোর ওপর শহরে ঢোকার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। কিন্তু পৌরসভার এ নির্দেশ কেউ মানছে না। এ জন্য দায়ী করা হয়েছে একশ্রেণীর ট্রাফিক পুলিশকে। ট্রাফিক পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা উৎকোচের বিনিময়ে অনুমোদনহীন ইজিবাইকগুলোকে শহরে প্রবেশের সুবিধা করে দিচ্ছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শহরের চিত্রা মোড়, উকিলবার চত্বর, দড়াটানা ঘেঁষে মুজিব সড়ক, হাসপাতাল মোড়, চৌরাস্তা, মণিহার চত্বর, পালবাড়ি, খাজুরা স্ট্যান্ড ও বকুলতলাসহ বিভিন্ন স্থানে ইজিবাইকের অঘোষিত স্ট্যান্ড গড়ে ওঠেছে। এসব স্থানে ট্রাফিক পুলিশ থাকা সত্ত্বেও কাউকে কোন কিছু বলা হচ্ছে না। নিয়মিত উৎকোচ আদায়ের বিনিময়ে ইজিবাইক চালকদের এক্ষেত্রে বিশেষ ছাড় দেয়া হচ্ছে বলে সূত্রের অভিযোগ। আর এ সুযোগ পেয়ে ইজিবাইক চালকরাও নির্দিষ্ট পয়েন্ট অতিক্রম করে গোটা শহর চষে বেড়াচ্ছে। কয়েকজন ইজিবাইক চালকের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, শহরের বকুলতলা, হাসপাতাল এলাকা, চিত্রার মোড়, উকিলবার চত্বর ও মুজিব সড়কসহ ১৯টি পয়েন্ট থেকে তাদের কাছ থেকে প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ টাকা করে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইজিবাইক চালকদের কাছ থেকে ট্রাফিক পুলিশের হয়ে শ্রমিক-কর্মচারী নামধারী একশ্রেণীর সদস্য চাঁদা আদায় করছে। পরে উৎকোচের এ টাকা ট্রাফিক পুলিশের উচ্চ পর্যায়ে ভাগবাটোয়ারা হয়। শুধু ইজিবাইক নয়, চাঁদা আদায় করা হচ্ছেÑ ট্যাক্সি, ম্যাক্সি, মাইক্রো, টেম্পো, নসিমন ও করিমন চালকদের কাছ থেকেও।
//ঢাকা, ১৬ আগস্ট (বাংলাটাইমস টুয়েন্টিফোর) // টি এম //






